মঙ্গলবার, ০২ Jun ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে পদোন্নতি লাভ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, চাকরি বাণিজ্য এবং শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলামকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে রাজনীতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ২০১৩ সালের ১৪ নভেম্বর অফিস সহায়ক পদ থেকে সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি লাভ করেন। অভিযোগ রয়েছে, এ পদোন্নতির ক্ষেত্রে তিনি জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সাংঘাইল গ্রামের মৃত ফজল হকের ছেলে তাজুল ইসলাম তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ। একসময় তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তার বাবা চট্টগ্রাম জুট মিলে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯০ সালে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় তিনি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে মাস্টার রোলে এমএলএস পদে চাকরি পান। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জে কর্মরত অবস্থায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজের, ছেলে ও ভাইদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক ঠিকাদারি লাইসেন্স তার ও তার স্বজনদের নামে নেওয়ার তথ্য ও পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব লাইসেন্স ব্যবহার করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বহু মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। দেবপাল এলাকার এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে চাকরি না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি প্রভাব খাটিয়ে নতুন সরকারের এক শিক্ষামন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে আগের মতোই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের পর তাকে মানিকগঞ্জ শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরে বদলি করা হলেও তিনি ঢাকায় অবস্থান করে প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর শিহাব উদ্দিন ও আনোয়ার হোসেন লিটন নামে দুই ব্যক্তি তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তার সম্পদের উৎস, পদোন্নতির বৈধতা এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম তদন্তের দাবি জানানো হয়।
শত কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাজধানীর রায়েরবাগ এলাকায় তাজুল ইসলামের চারটি বাড়ি রয়েছে। এছাড়া নীলক্ষেত ইসলামিয়া মার্কেটে চারটি দোকান, গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ারে দুটি দোকানসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির মালিক তিনি। অভিযোগ রয়েছে, তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে, যার অধিকাংশের উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রতারণা মামলার আসামিদের পক্ষে তদবিরের অভিযোগ
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, তিন দিনের ছুটি নিয়ে তিনি বর্তমানে নিজ এলাকা চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে অবস্থান করছেন। এদিকে গত ৩০ মে প্রতারণা মামলায় সাংঘাইল গ্রামের বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন গ্রেফতার হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। একই মামলায় দ্বিতীয় আসামি হিসেবে সাদ্দামের বাবা মো. বিল্লাল হোসেনকেও গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, গ্রেফতারকৃতদের মুক্ত করার লক্ষ্যে তাজুল ইসলাম বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এ কাজে তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ইকবাল হোসেনের সহযোগিতা নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, ব্যক্তিগত স্বার্থে তাজুল ইসলাম সাদ্দাম হোসেনকে স্থানীয় একটি মসজিদের সেক্রেটারি পদে বসাতে ভূমিকা রেখেছিলেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ছুটিতে তাজুল, বক্তব্য মেলেনি
সরেজমিনে ১ জুন দুপুরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলাম ৩ জুন পর্যন্ত ছুটিতে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা হলেও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য মো. তাজুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে এলাকাবাসী, সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত জাল সনদ ব্যবহার, চাকরি বাণিজ্য, ঠিকাদারি কার্যক্রমে অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে জনমনে আস্থা ফিরে আসবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।